পবিত্র কোরআন-হাদিসে একটি বিশেষ দিনের কথা বারবার এসেছে, যেদিন প্রতিটি মানুষের সমস্ত কর্মের হিসাব নেওয়া হবে। যে দিন হবে অত্যন্ত কঠিন। সে দিন প্রতিটি কাজ, প্রতিটি কথা ও প্রতিটি দৃষ্টির হিসাব হবে। সে দিন প্রতিটি মানুষকে নিজ নিজ আমলনামা হাতে নিয়ে মহাপ্রতাপশালী রবের সামনে দাঁড়াতে হবে। এই ভাবনা মুমিনের অন্তরে ভয় জাগায়। কারণ সেদিন প্রত্যেকে ভীত থাকবে, কেউ কাউকে সহযোগিতা করার মতো অবস্থা থাকবে না।
কিন্তু সেই কঠিন দিনেও মহান আল্লাহর কিছু বান্দার জন্য রহমতের দরজা খোলা থাকবে। কারণ সেদিন মহান আল্লাহ তাঁর কিছু বান্দার হিসাব সহজ করে দেবেন। ইসলামের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘হিসাবে ইয়াসির’, অর্থাৎ সহজ হিসাব। নিম্নে ‘হিসাবে ইয়াসির’ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যাকে তার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, অত্যন্ত সহজভাবেই তার হিসাব-নিকাশ করা হবে।’ (সুরা ইনশিকাক, আয়াত : ৭-৮)
এই আয়াতে আরবিতে ‘হিসাবাই ইয়াসিরা’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ হলো, সহজ হিসাব।
কিয়ামতের দিন যাদের হিসাব সহজ হবে, তারা কতই না ভাগ্যবান। কারণ আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন যারই হিসাব নেওয়া হবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। [আয়েশা (রা.) বলেন] আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ কি বলেননি, ‘অতঃপর যার আমলনামা তার ডান হাতে দেওয়া হবে তার হিসাব সহজভাবেই নেওয়া হবে’। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তা কেবল পেশ করা মাত্র। কিয়ামতের দিন যার হিসাব খতিয়ে দেখা হবে তাকে অবশ্যই আজাব দেওয়া হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৫৩৭)
সুবহানাল্লাহ! সুতরাং কঠিন কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর রহমত পেতে হলে নেক গুরুত্বসহকারে নেক-আমল করতে হবে। শুধু আল্লাহ সব মাফ করে দেবেন বলে পাপে নিমজ্জিত হয়ে থাকার সুযোগ নেই। কারণ সেদিন ‘হিসাবে ইয়াসিরের’ ভাগ্য অর্জন করতে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে, যা অন্য আয়াত দ্বারা স্পষ্ট হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে। পরিণামে আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পূণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৭০)
হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমার উম্মতের সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ লোকেরা জিজ্ঞেস করল, তারা কারা, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)? তিনি বললেন, যারা ক্ষতস্থানে লোহা পুড়ে লাগায় না এবং (জাহিলী যুগের ন্যায়) ঝাড়ফুঁক বা মন্ত্রের দ্বারা চিকিৎসা কামনা করে না; বরং তারা আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করে। (মুসলিম, হাদিস : ৪১২)
এ জন্য সব বিষয়ে আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করা ও সব কুসংস্কার থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা মুমিনের কর্তব্য। পাশাপাশি মহান আল্লাহর রহমতের আশাও রাখতে হবে। কারণ কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাঁর কিছু বান্দাকে খুব সহজে পার করে দেবেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ মুমিন ব্যক্তিকে নিজের কাছে নিয়ে আসবেন এবং তার ওপর স্বীয় আবরণ দ্বারা তাকে ঢেকে নেবেন। তারপর বলবেন, অমুক পাপের কথা কি তুমি জান? তখন সে বলবে, হ্যাঁ, হে আমার রব! এভাবে তিনি তার কাছ হতে তার পাপগুলো স্বীকার করিয়ে নেবেন। আর সে মনে করবে যে তার ধ্বংস অনিবার্য। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, ‘আমি পৃথিবীতে তোমার পাপ গোপন রেখেছিলাম। আর আজ আমি তা মাফ করে দেব।’
তারপর তার নেক আমলনামা তাকে দেওয়া হবে। কিন্তু কাফির ও মুনাফিকদের সম্পর্কে সাক্ষীরা বলবে, এরাই তাদের প্রতিপালক সম্পর্কে মিথ্যা বলেছিল। সাবধান, জালিমদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত। (বুখারি, হাদিস : ২৪৪১)
তাই কুফর ও শিরক থেকে নিজেদের দূরে রাখতে হবে। গুনাহ ছাড়তে হবে। গুনাহ হয়ে গেলে গোপনে মহান আল্লাহর কাছে তাওবা করে নিতে হবে। দম্ভভরে নিজের ও অন্যের গুনাহ প্রকাশ করে বেড়ানোও আরেকটি গুনাহ। আর তা গোপন রাখা আল্লাহর ক্ষমা লাভের একটি বড় উপায় হতে পারে। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি যে আমার সয উম্মতকে মাফ করা হবে, তবে প্রকাশকারী ব্যতীত। আর নিশ্চয় এ বড়ই অন্যায় যে কোনো লোক রাতের বেলা অপরাধ করল যা আল্লাহ গোপন রাখলেন। কিন্তু সে সকাল হলে বলে বেড়াতে লাগল, হে অমুক, আমি আজ রাতে এই এই কাজ করেছি। অথচ সে এমন অবস্থায় রাত কাটাল যে আল্লাহ তার কর্ম লুকিয়ে রেখেছিলেন, আর সে ভোরে উঠে তার ওপর আল্লাহর দেওয়া আবরণ খুলে ফেলল। (বুখারি, হাদিস : ৬০৬৯)
অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে লোক কোনো ঈমানদারের দুনিয়া থেকে কোনো মুসিবত দূর করে দেবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার থেকে মুসিবত সরিয়ে দেবেন। যে লোক কোনো দুস্থ লোকের অভাব দূর করবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দুরবস্থা দূর করবেন। যে লোক কোনো মুসলিমের দোষত্রুটি লুকিয়ে রাখবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষত্রুটি লুকিয়ে রাখবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সহযোগিতায় আত্মনিয়োগ করে, আল্লাহ ততক্ষণ তার সহযোগিতা করতে থাকেন। (মুসলিম, হাদিস : ৬৭৪৬)
তাই গুনাহ হয়ে গেলে তার জন্য আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হতে হবে এবং তা গোপন রাখতে হবে। পাশাপাশি ঈমানের ওপর অটল থাকতে হবে। কারণ কিয়ামতের দিন কলেমার পাল্লা এত ভারি হবে যে তার সামনে পাহাড়সম গুনাহও হালকা হয়ে যাবে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৬৩৯)’
এ ছাড়া বান্দার হকের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ মহান আল্লাহ বান্দার হক মাফ করবেন না। মহান আল্লাহ আমাদের সবার হিসাবকে সহজ করুন।
