দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) জনবল সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। অনুমোদিত টিকাদানকর্মীর ৪০ শতাংশ পদই শূন্য রয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে একসময় দক্ষিণ এশিয়ায় অনুকরণীয় সাফল্য অর্জন করা বাংলাদেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। সম্প্রতি দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌথ স্বাধীন পর্যালোচনা দলের (জয়েন্ট ইনডিপেনডেন্ট রিভিউ টিম) প্রতিবেদনে ইপিআইয়ের জনবল, টিকা সংরক্ষণ, সেবার পরিধি ও ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত এসব ঘাটতি উঠে এসেছে। কর্মসূচিটির অর্জন ধরে রাখতে দ্রুত শূন্য পদ পূরণ, প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পদ সৃষ্টি, টিকা সংরক্ষণব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং মাঠপর্যায়ে সেবা পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের সুপারিশ করেছে দলটি। পর্যালোচনা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইপিআইয়ের কোল্ডচেইন টেকনিশিয়ানের ৫৩ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য সহকারী ও স্বাস্থ্য পরিদর্শকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ৩৪ শতাংশ এবং ইপিআইয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ৪৫ শতাংশ পদ শূন্য। শহরাঞ্চলে টিকাদানকর্মীদের ৯০ শতাংশই বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কর্মী। তাদের কার্যক্রমে নজরদারিও দুর্বল। এ ছাড়া ২০২৫ সালে টিকাদানকর্মীদের সাত মাসের কর্মবিরতিতে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়। স্বেচ্ছাসেবীদের পারিশ্রমিক বন্ধ হয়ে যাওয়ায়ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে প্রভাব পড়েছে।
হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণ, টিকার পরিস্থিতি এবং ইপিআইয়ের কার্যক্রম মূল্যায়নে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফ, টিকা সরবরাহ ও বিতরণে কাজ করা বৈশ্বিক জোট গ্যাভি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ইপিআই কর্মকর্তা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রতিনিধিদের নিয়ে যৌথ স্বাধীন পর্যালোচনা দল গঠন করা হয়। নয়টি উপদলে বিভক্ত ৭০ সদস্যের দলটি গত ৩ অক্টোবর কাজ শুরু করে এবং ১৪ অক্টোবর সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। একটি জাতীয় দলের পাশাপাশি আটটি বিভাগীয় দল মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে। প্রতিটি বিভাগীয় দল দুটি জেলার দুটি করে উপজেলা পরিদর্শন করে। এ সময় তারা টিকাদানকেন্দ্র, স্কুল ও মাদ্রাসা পরিদর্শনের পাশাপাশি টিকা নিতে এসে ফিরে যাওয়া মা, সদ্য মা হয়েছেন এমন নারী এবং বিভিন্ন পরিবারের মা ও মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিতও জনবল সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ঘাটতি পূরণে সরকার প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেবে এবং বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ বাস্তবায়নে কাজ করবে। মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭৯ সালে শুরু হওয়া বাংলাদেশের ইপিআই একসময় সীমিত সম্পদ দিয়ে বিপুল জনগোষ্ঠীকে টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছিল। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং টিকাদান কার্যক্রমের পরিধি বাড়লেও সে অনুযায়ী জনবল কাঠামো সম্প্রসারিত হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি টিকাদানকেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনা জনসংখ্যার তথ্যসহ ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা (জিআইএস) প্রযুক্তির মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে জনসংখ্যার ঘনত্ব ও ঝুঁকি বিবেচনায় টিকাদানকেন্দ্রের বণ্টনে অসমতা রয়েছে। দুর্গম ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় কেন্দ্র কম। আরবান ইমিউনাইজেশন স্ট্র্যাটেজি-২০১৯ এবং ইপিআই মাইক্রোপ্ল্যান-২০২৪ অনুযায়ী, প্রতি ৫০ হাজার মানুষের জন্য ছয়জন টিকাদানকর্মী প্রয়োজন। নগর টিকাদান কৌশলে প্রতি ৮ হাজার ৩০০ মানুষের বিপরীতে একজন টিকাদানকর্মীর মানদণ্ডও উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু এসব জনবল চাহিদা পূরণ করা হয়নি। গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্য সহকারীদের মাধ্যমে এবং শহরাঞ্চলে স্থানীয় সরকার ও বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে স্থায়ী ও অস্থায়ী টিকাদানকেন্দ্রে সেবা দেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি ওয়ার্ডে মাসে আটটি টিকাদান সেশন এবং প্রতিটি ইউনিয়নে মাসে ২৪টি আউটরিচ সেশন পরিচালনার কথা। কিন্তু প্রয়োজনীয় কর্মী ও অর্থের অভাবে এসব কার্যক্রম নিয়মিত ও মানসম্মতভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। মূল্যায়ন দলের সদস্য জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও টিকাবিজ্ঞানী ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, মাঠপর্যায়ে টিকার সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখা এবং নির্ধারিত নিয়মে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ঘাটতি পাওয়া গেছে। এতে টিকার গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। জেলা থেকে উপজেলা পর্যায়ে টিকা পরিবহনের জন্যও পর্যাপ্ত অর্থ নেই। তিনি বলেন, জনবল নিয়োগের পাশাপাশি টিকার তাপমাত্রা যথাযথভাবে বজায় রাখা, সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করা এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের যাতায়াতের জন্য অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোল্ডচেইন ব্যবস্থাপনায় কর্মী সংকট টিকার সংরক্ষণ ও বিতরণ কার্যক্রমকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। টিকার কার্যকারিতা বজায় রাখতে উৎপাদন ও সরবরাহ থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ পর্যন্ত নির্ধারিত তাপমাত্রা ও সংরক্ষণবিধি অনুসরণ করা জরুরি। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি একসময় সীমিত সম্পদ দিয়ে বিপুল জনগোষ্ঠীকে টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বে অনুকরণীয় সাফল্য অর্জন করেছিল। এ সাফল্যের মূল ভিত্তি ছিল কার্যকর ব্যবস্থাপনা, প্রান্তিক পর্যায়ে সেবা পৌঁছে দেওয়ার উপযোগী জনবল এবং শক্তিশালী নজরদারিব্যবস্থা। তবে গত আট থেকে ১০ বছরে এই নজরদারি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, সাধারণত প্রতি চার থেকে পাঁচ বছর পর আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ইপিআই কর্মসূচির পর্যালোচনা করা হয়। এতে কর্মসূচির দুর্বলতা চিহ্নিত করার পাশাপাশি সেগুলো দূর করার সুপারিশ দেওয়া হয়। কিন্তু গত আট বছরে এ ধরনের কোনো পর্যালোচনা হয়নি। বিগত সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকার—কেউই এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেনি। তিনি আরও বলেন, আট বছর পর সম্প্রতি দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ইপিআই কর্মসূচির পর্যালোচনা করা হয়েছে। এ জন্য আটটি বিভাগে বিশেষজ্ঞ দল পাঠানো হয়। তারা সরেজমিনে কর্মসূচি পরিদর্শন করেছেন এবং টিকাদানকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে বিভিন্ন ঘাটতি চিহ্নিত করেছেন। তাদের দেওয়া সুনির্দিষ্ট সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকার কাজ করবে। ডা. এম এ মুহিত জানান, ইতোমধ্যে দেশের ৬৪ জেলার সিভিল সার্জন ও আট বিভাগের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকদের সঙ্গে সুপারিশগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। চিহ্নিত ঘাটতি পূরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
