ইন্টারনেটে তথ্যের সহজলভ্যতার কারণে অনেকেই এখন কোরআনের আয়াতের অর্থ, তাফসির বা যেকোনো কাজের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধান সম্পর্কে জানতে এআইয়ের দ্বারস্থ হচ্ছেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কাঙ্খিত উত্তর সামনে এনে দিচ্ছে এআই। উত্তরের সঙ্গে সঙ্গে হাজির করছে কোরআনের আয়াত, হাদিস ও বিভিন্ন ফেকহের কিতাবের সূত্র। এতো সব রেফারেন্সের পরও ধর্মীয় বিষয়ে জানার ক্ষেত্রে এআই আসলে কতটা নির্ভরযোগ্য আমাদের জন্য? তথ্য জানার সহজলভ্য উপায় এআইয়ের আবিস্কার নতুন হলেও যেকোনো বিষয় জানার জন্য সঠিক পদ্ধতিতে তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা নতুন নয়। এ প্রসঙ্গে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো তাবাইয়্যুন। এর অর্থ, কোনো তথ্য গ্রহণের আগে তা সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা এবং বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেওয়া। তথ্য জানার মাধ্যম বদলে গেলেও এই নীতির প্রাসঙ্গিকতা অটুট রয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে মুমিনরা, কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তোমরা তা যাচাই করে দেখো, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও। (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৬)।
এআই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দিতে পারে। ধর্মীয় কোনো প্রশ্ন করলে উত্তরটি সুশৃঙ্খলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, যুক্তি সাজিয়ে উপস্থাপন করা হয় এবং কোরআনের আয়াত বা হাদিসের উদ্ধৃতিও দেওয়া হয়। স্বাভাবিকভাবেই এমন উত্তরকে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।
কিন্তু কোনো উত্তর বিশ্বাসযোগ্য শোনালেই তা সঠিক বা পূর্ণাঙ্গ হয়ে যায় না। কোরআনের আয়াত কিংবা হাদিস ভুলভাবে উদ্ধৃত হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মনগড়া উদ্ধৃতিও দেওয়া হতে পারে। এআই এমন সূত্রের উল্লেখ করতে পারে, যা দেখতে আসল মনে হলেও বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই। এ ধরনের ভুলকে এআইয়ের হ্যালুসিনেশন বলা হয়।
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ইসলামী আইনবিষয়ক ৮০টি প্রশ্নের ভিত্তিতে পাঁচটি এআই-চালিত ইসলামি চ্যাটবটের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়। এতে কোরআনের আয়াত ও হাদিসের ভুল সূত্র উল্লেখ, ধর্মীয় বিধানের অতিসরলীকরণ এবং একই বিষয়ে অসংগতিপূর্ণ উত্তর দেওয়ার মতো সমস্যা পাওয়া যায়।
তাবাইয়্যুনের শিক্ষা হলো, নিজের চিন্তাশক্তি সক্রিয় রাখা। তথ্য খুঁজে পেতে ও বুঝতে এআই সাহায্য করতে পারে। কিন্তু আত্মবিশ্বাসী বা সুন্দরভাবে সাজানো উত্তর মানেই সঠিক উত্তর নয়। এআই আমাদের চিন্তাভাবনায় সহায়তা করতে পারে, তবে এর দেওয়া তথ্য নিয়ে নিজেকেও ভাবতে হবে।
এই নীতি শুধু এআইয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়। ইনস্টাগ্রামের পোস্ট, টিকটকের ভিডিও কিংবা হোয়াটসঅ্যাপে পাওয়া কোনো বার্তাও খুব বেশি শেয়ার হয়েছে বা বারবার চোখে পড়ছে বলে তা নির্ভরযোগ্য হয় না। একই তথ্যের পুনরাবৃত্তি কখনোই যাচাইয়ের বিকল্প নয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে বিষয়ে তোমার নিশ্চিত জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর—এগুলোর প্রতিটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। (সুরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৬)।
এআইয়ের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো এর তাৎক্ষণিক উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা। প্রশ্ন করা হলো, আর উত্তর পাওয়া গেল—মাঝখানে অপেক্ষা করতে হয় না।
এই সুবিধা সত্যিই কাজে লাগতে পারে। তবে এর ফলে আমাদের প্রত্যাশাও হয়তো বদলে যাচ্ছে। আমরা ভাবতে শুরু করছি, প্রতিটি প্রশ্নেরই দ্রুত ও সহজ উত্তর থাকা উচিত। অথচ ধর্মীয় জ্ঞানের বিষয়টি সব ক্ষেত্রে এমন নয়।
এর পেছনে শুধু সতর্কতার বিষয়টি কাজ করে না। ইসলামী জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যে জ্ঞানকে শুধু তথ্য সংগ্রহের বিষয় হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি এমন এক নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অনুশীলন, যা নিয়ত এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির সঙ্গে সম্পর্কিত।
এ ক্ষেত্রে একটি সুপরিচিত ঘটনা বিবেচনা করা যেতে পারে। একবার দুজন ব্যক্তি আলাদাভাবে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর কাছে জানতে চাইলেন, কোনো মুমিনকে হত্যা করলে হত্যাকারী ক্ষমা পেতে পারে কি না। তিনি দুজনকে ভিন্ন উত্তর দিয়েছিলেন। যে ব্যক্তি কাউকে হত্যার পরিকল্পনা করছেন বলে তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, তাকে তিনি বলেছিলেন, ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ নেই। এর উদ্দেশ্য ছিল তাকে হত্যার মতো অপরাধ থেকে বিরত রাখা। অন্যদিকে, যিনি ইতোমধ্যে কাউকে হত্যা করেছেন এবং তওবা করতে চাইছেন, তাকে তিনি বলেছিলেন, ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি তাকে তওবার পথে উৎসাহিত করেছিলেন।
এখানে বিধানের ব্যাখ্যায় পার্থক্য এসেছিল প্রশ্নকারীর পরিস্থিতির কারণে। একই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে শুধু শব্দগুলো বিবেচনা করাই যথেষ্ট ছিল না; প্রশ্নকারী কে এবং কী পরিস্থিতিতে প্রশ্নটি করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শুধু পাঠ্য বিশ্লেষণ ও ধরন শনাক্ত করার মাধ্যমে এমন বিবেচনাবোধের বিকল্প তৈরি করা যায় না। কারণ, বিষয়টি শুধু লেখার অর্থ বোঝার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তাই এআইয়ের মাধ্যমে ধর্মীয় প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে কয়েকটি সহজ অভ্যাসের মাধ্যমে এর সমাধান করা সম্ভব।
সূত্র যাচাই করুন এআই কোনো কোরআনের আয়াত, হাদিস কিংবা ধর্মীয় বক্তব্য উল্লেখ করলে নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন।
প্রেক্ষাপট বিবেচনা করুন এআই কোনো একজন আলেম বা নির্দিষ্ট কারো মতকে একমাত্র মত হিসেবে উপস্থাপন করছে কি না, তা খেয়াল করুন। নির্দেশনা প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পরিস্থিতির কোনো প্রভাব রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনা করুন।
কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন, তা বুঝুন প্রশ্নটি যদি ধর্মীয় বিধান কিংবা আপনার ব্যক্তিগত পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে যোগ্য আলেমের সঙ্গে কথা বলার কথা বিবেচনা করুন। ধর্মীয় নির্দেশনা পেতে ফতোয়া বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
আমরা যেভাবে তথ্য খুঁজি, শিখি এবং চারপাশের পৃথিবীকে বোঝার চেষ্টা করি, সেখানে এআইয়ের ব্যবহার আরও স্বাভাবিক হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা যায়। ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের সুযোগও আগের তুলনায় সহজলভ্য হয়েছে। তবে কোনো তথ্য সহজে পাওয়া যায় বলেই তা নির্ভরযোগ্য হয়ে যায় না।
এখানেই আবারও ফিরে আসে তাবাইয়্যুনের শিক্ষা। এআই আসার আরও অনেক আগে থেকেই ইসলাম তথ্যের উৎস সম্পর্কে সচেতন হতে, গ্রহণের আগে তা যাচাই করতে এবং অন্যের কাছে কোনো তথ্য পৌঁছে দেওয়ার সময় দায়িত্বশীল থাকার শিক্ষা দিয়েছে। এআইয়ের যুগে তাবাইয়্যুনের গুরুত্ব সম্ভবত এখানেই সবচেয়ে বেশি।
প্রযুক্তি উত্তর খুঁজে পাওয়ার কাজকে সহজ ও দ্রুত করতে পারে। কিন্তু নিজে যাচাই করা, চিন্তাভাবনা করা এবং প্রয়োজন হলে যথাযথ নির্দেশনা নেওয়ার বিকল্প হতে পারে না। ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতার যে প্রয়োজন, তা আগের মতোই রয়ে গেছে।
